1. hmgrobbani@yahoo.com : admin :
  2. news@soroborno.com : Md. Rabbani : Md. Rabbani
বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২, ১১:৫৫ অপরাহ্ন

ভয়ঙ্কর টর্চার সেল ‘মাইন্ড এইড হাসপাতাল’

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২০

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার আনিসুল করিম শিপন হত্যার পর মঙ্গলবার বিকালে সিলগালা করে দেয়া হয়েছে আদাবরের মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড ডি-অ্যাডিকশন হাসপাতালটি।

মাদক নিরাময়কেন্দ্র হিসেবে হাসপাতালটি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অনুমোদন নিয়েছিল, অথচ এখানে মানসিক রোগীদেরও চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হত। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমোদন ছাড়া মানসিক চিকিৎসা দেয়ার কোন সুযোগ নেই। সেখানে মানসিক হাসপাতাল হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদফতরে আবেদন করে অনুমোদন না পাওয়ার পরও মানসিক রোগীর চিকিৎসা দিয়ে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি।

হাসপাতালটির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেখানে মানসিক চিকিৎসার জন্য সার্বক্ষণিক কোন বিশেষজ্ঞ থাকতেন না। কোঅর্ডিনেটর, কোম্যানেজার ও ওয়ার্ডবয়দের দিয়েই চলছিল এটি। এখানে নতুন কোন মানসিক রোগী এলেই তাদের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে বন্দি করে রাখা হত। সাউন্ড প্রæফ রুমে নতুন রোগীদের পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা নির্যাতন করা হত। মারধরের সময় উ”চশব্দে গান বাজানো হত যাতে বাইরে থেকে চিৎকার না শোনা যায়। এক কথায় ভয়ঙ্কর টর্চারসেল ছিল এই হাসপাতালটি।

মাইন্ড এইড হাসপাতালে গত সোমবার দুপুরে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুলকে ভর্তি করতে যান তার স্বজনেরা। সেখানেই তাকে মারধর করেন হাসপাতালটির কর্মীরা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি নিস্তেজ হয়ে যান। পরে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মারধরের ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ওই ঘটনায় রাতেই আনিসুলের বাবা ফাইজুদ্দীন আহম্মেদ বাদী হয়ে আদাবর থানায় হত্যা মামলা করেন। পুলিশ মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত হাসপাতালের পরিচালক নিয়াজ মোর্শেদ, ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ, কো-অর্ডিনেটর রেদোয়ান সাব্বিরসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে।

যেভাবে রোগীদের নির্যাতন করা হত এই হাসপাতালে:
মঙ্গলবার সরেজমিনে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা গেছে, বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির ২ নম্বর রোডের তিন তলা ভবনের এই হাসপাতালে রয়েছে প্রত্যেক তলায় ৭টি করে রুম। তার মধ্যে একটি করে সাউন্ডপ্রুফ রুম, সেই রুমে এসি এবং সিসি ক্যামেরা লাগানো। হাসপাতালটির বেড সংখ্যা ৪৩টি, দুটি কেবিন রয়েছে। নিচতলা মহিলা রোগীদের জন্য এবং দোতলা ও তৃতীয় তলা পুরুষ রোগীদের জন্য। পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল দোতলার বারান্দাঘেষা যে কক্ষটিতে মারা গেছেন সেটিও একটি সাউন্ডপ্রুফ রুম। কক্ষের দেয়ালে ফোম লাগানো, মেঝেতে দুটি জাজিম রয়েছে। রুমটিতে একটি দরজা, তবে কোন জানালা বা ভেন্টিলেটর নেই।

হাসপাতালের স্টাফ শারমিন জান্নাত ও রাঁধুনী রুমা আক্তার দৈনিক খোলা কাগজকে জানান, এখানে নতুন রোগী আসলেই তাদের এই কক্ষটিতে এনে আটকে রাখা হয়। হাসপাতালের ওয়ার্ডবয়রা নতুন রোগীদের এখানে নিয়ে আসেন। কোন রোগী চিৎকার, হট্টগোল করলে তাদের হাত-পা বেঁধে রাখা হয়, ইঞ্জেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে রাখা হয়, আবার মাঝেমধ্যে মারধরও করা হয়। নতুন রোগীদের এভাবে কমপক্ষে এক সপ্তাহ এই কক্ষে আটকে রাখার পর অন্য রুমে নেয়া হয়।

শারমিন বলেন, আমরা সাধারণত মহিলা রোগীদেরই দেখা শোনা করি। পুরুষ রোগীদের দেখাশোনা করে ওয়ার্ডবয়রা। আমাদের উপরে আসতে দেয়া হয় না। তবে মাঝে মধ্যে খাবার দিতে এসে রোগীর মুখে শুনেছি যে তাদের মারধর-নির্যাতন করা হয়।

রুমা আক্তার বলেন, ওয়ার্ডবয়রা সাধারণত নতুন রোগীকে এখানে নিয়ে আসেন। রোগীরা বেশি উত্তেজিত হলে তাদের ইঞ্জেকশন দেয়া হয়, মাঝেমধ্যে মারধরও করা হয়। কিš‘ সেদিন স্যারতো (আনিসুল) কোন চিৎকার-চেচামেচি না করেই উপরে উঠে গেছেন। তবে তিনি এই রুমে ঢুকতে চান নি। পরে ৬-৭ জন মিলে স্যারকে টেনে হিচড়ে রুমে ঢুকায়। এরপর নাকি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে স্যারকে মারধর করতে। স্যার যখন নিস্তেজ হয়ে পড়েন তখন তার আত্মীয় স্বজনকে দেখানোর জন্য নার্সদের ডাক্তার সাজিয়ে রুমে এনে স্যারের শারীরিক পরীক্ষা করা হয়, বাইরে থেকে অক্সিজেন আনা হয়।

অনুমোদন না পেয়েও মানসিক হাসপাতাল পরিচালনা:
২০১৯ সালে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল মাইন্ড এইড হাসপাতালটি। এজন্য মালিক ও পরিচালকরা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে অনুমতি/লাইসেন্স নিয়েছিল। কিন্তু‘ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একই সঙ্গে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা সেবাও চালু করেন। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোনো অনুমতি বা লাইসেন্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ছিল না।

পরবর্তীতে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মানসিক হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি চেয়ে আবেদন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পরিদর্শনে এসে তেমন কোন লজিস্টিক সুবিধা ও পর্যাপ্ত জনবল না দেখে তাদের আবেদন ¯’গিত রাখে অধিদফতর।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন অফিসার ডা. মইনুল আহসান দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মানসিক হাসপাতাল চালানোর আবেদন করেছিল মাইন্ড এইড। আমরা তখন পরীক্ষা করে দেখেছি হাসপাতালটি চালানোর মত সুবিধা ও জনবল কিছুই তাদের ছিল না। সেজন্য মার্চ মাসে তাদের আবেদন আমরা পেন্ডিং (¯’গিত) করি। ¯’গিত আদেশের পর তারা যদি কোন চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে থাকে তা সম্পূর্ণ অবৈধ। তারা এটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ও পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে চালাচ্ছিল।

জেলখানার আদলে গড়ে তোলা হয়েছে হাসপাতাল:
মঙ্গলবার বিকালে হাসপাতালটি পরিদর্শন করে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ বলেন, হাসপাতালটি পরিদর্শনের পর কোনভাবেই এটিকে হাসপাতাল বলে মনে হয় নি। হাসপাতালের বারান্দায়ও তারা এমনভাবে রুম বানিয়েছে, যেখানে বাতাস ঢোকার কোন ব্যব¯’া নেই। সেখানে সু¯’ মানুষ গেলেও অসু¯’ হয়ে যাবে।

হাসপাতালটিতে নেই কোন ডাক্তার, ছিল না এটি পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতিও।

একটি বাড়ির মধ্যে জেলখানার আদলে গড়ে তোলা হয়েছে এই হাসপাতাল। তারা দালালের মাধ্যমে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে এনে চিকিৎসা দিত।

সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছেঃ আইজিপি

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্যাতনে এএসপি আনিসুল করিমের মৃত্যুর ঘটনায় সর্বো”চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হ”েছ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ। গতকাল বুধবার দুপুরে এক বার্তায় এ তথ্য জানায় পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ।

পুলিশ সদর দফতর জানায়, এএসপি শিপন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইজিপির নির্দেশে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হচে্ছ, যেন এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার কোনো পুনরাবৃত্তি না হয়।

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি