1. hmgrobbani@yahoo.com : admin :
  2. news@soroborno.com : Md. Rabbani : Md. Rabbani
  3. sayefrahman7@gmail.com : Sayef Rahman : Sayef Rahman
শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৩, ০২:৫৯ অপরাহ্ন

রাজশাহীতে তুর্কি চা

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২২

এমন নকশাদার চৌকো বাক্সে পরিবেশন করা হয় তুর্কি চা ছবি: প্রথম আলো
দোকানে ঢুকলেই হাতে আসবে গরম ধোঁয়া ওঠা চা। শোনা যাবে চায়ে চিনি মেশানোর টুংটাং শব্দ। এমনটাই তো হওয়ার কথা। তবে আর দশটা চায়ের দোকান থেকে এই দোকান একটু আলাদা। দোকানে ঢুকলে প্রথমেই নজর কাড়ে হরেক রঙের নকশা।

সেই নকশা দেখতে দেখতে কেটে যায় কিছুটা সময়। হাতে থাকা মুঠোফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলতেই হয়। ছোট্ট দোকানটির দেয়াল, ছাদজুড়ে লাল, নীল, হলুদ, কমলা রঙের আলপনা ধাঁচের নকশা। চা ও হালকা নাশতা পরিবেশনের ট্রেগুলোও এমন বাহারি নকশায় ভরা।

শুধু নকশা নয়, দোকানের চায়েও কিন্তু রয়েছে বৈচিত্র্য। চা বানানোর পাত্রটিও বেশ রাজকীয়। পিতলের সরু মুখের পাত্রে সূক্ষ্ম কারুকাজ। তাতে গরম বালুর তাপে বানানো হচ্ছে ঘন দুধ, পেস্তাবাদাম আর মসলা মেশানো তুর্কি চা। চুমুকেই সবকিছুর মিশেলে চায়ের ভিন্ন স্বাদটা টের পাওয়া যায়।

এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ দোকানটি দুজনের হাতে গড়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মালিহা আহমেদ ও পলিটেকনিকের শিক্ষার্থী মাহির আসিফ অক্ষর এই দোকানের কারিগর। সব সময়ই বৈচিত্র্যপূর্ণ কিছু করতে চান এই দুই বন্ধু। সেই ভাবনা থেকেই শুরু। এই দুই বন্ধু বললেন, এসব সজ্জার কোনোকিছুই পেশাদার কাউকে দিয়ে করানো নয়।

মালিহা আহমেদ ও মাহির আসিফ অক্ষরের হাতে গড়া এই বৈচিত্র্যপূর্ণ দোকান
মালিহা আহমেদ ও মাহির আসিফ অক্ষরের হাতে গড়া এই বৈচিত্র্যপূর্ণ দোকানছবি: প্রথম আলো
মাহির বলেন, ‘ভাত তো সব দোকানেই পাওয়া যায়। তবে ভাতটা যদি ভিন্নভাবে পরিবেশন করা যায় তাহলে সেটা মানুষকে টানে।’ সে চিন্তা থেকেই তাঁরা চা ও স্ন্যাক্সের পরিবেশনটা অন্য রকমভাবে করার চেষ্টা করেছেন। অন্য রকম করতে গিয়ে প্রথমেই ভেবেছেন তারুণ্যের ট্রেন্ডের কথা।

মালিহা বলেন, তরুণদের পছন্দের তালিকায় আছে তুর্কি ধাঁচ। তাই সেই আদলেই দোকানটি সাজিয়েছেন তাঁরা। দোকানের নাম দিয়েছেন ট্যারফ। এটি পারসি শব্দ। পারসিতে এর উচ্চারণ তারুফ। তবে দোকানটি প্রচলিত ট্যারফ নামে। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় আপ্যায়ন। রাজশাহীর কাদিরগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঠিক উল্টো দিকেই এই দোকান। আশপাশে বেশ কয়েকটি স্কুল ও কলেজ রয়েছে। তা ছাড়া শিক্ষা নগরী হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখেই দোকানটির সজ্জা ও খাবারের পরিকল্পনা করেছেন মালিহা ও মাহির।

মালিহা রাজশাহীতে বেসরকারি বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। ট্যারফ–এ আসা অতিথিদের আপ্যায়নের অনেকটা সামলান তিনি। নিজেই বাড়িতে রাত জেগে চায়ের সঙ্গে পরিবেশনের জন্য নাশতা বানান। নাশতার মধ্যে রয়েছে শিঙাড়া, সমুচা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফুচকা। আছে বিভিন্ন পানীয়। আর অবশ্যই তুর্কি ধাঁচে বানানো চা ও কফি। আছে মসলা চা ও মালাই চা।

মালিহাকে নাশতা বানানোর কাজে সহায়তা করেন আরও দুজন। ট্যারফের নকশা, আপ্যায়ন, হিসাব রাখার কাজটা মালিহা ও মাহির দুই বন্ধু মিলে করেন। তাঁদের সহায়তা করেন তিথি, তারা, নিপা ও নীরব নামে আরও চারজন। তাঁরা রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী।

বালুর তাপে বানানো হচ্ছে চা

মাহির রাজশাহীতে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি দুই বন্ধু মিলে সামলাচ্ছেন স্বপ্নের ট্যারফ। শুরু হয় বিকেল ৪টা থেকে। দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হয় রাত ১১টায়। এরপর বাসায় গিয়ে মালিহা তাঁর সহযোগীদের নিয়ে শুরু করেন রান্না। নতুন সব ধাঁচে রান্না করতে পছন্দ করেন মালিহা। ইউটিউবে দেখেছেন তুরস্কে চা বালুর তাপে বানানো হয়। সেটাকেই এদিক–ওদিক করে বানিয়েছেন তুর্কি চা। শিঙাড়াতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। আলুর সঙ্গে আছে মুরগির মিহি করা কিমা, বাদাম আর সুগন্ধি মসলা।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দারুণ পছন্দ ট্যারফ। মাত্র ছয় মাস আগে যাত্রা শুরু হলেও বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত গমগম করে দোকানটি। গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ সামনে নিয়ে আড্ডায় মুখর হয়ে ওঠেন বন্ধুরা। শুধু শিক্ষার্থী বা তরুণেরা নন, ট্যারফের আসেন সব বয়সী মানুষ। মাহির বলেন, বয়োজ্যেষ্ঠরা এসে উৎসাহ দেন।

মাহির বলেন, ‘আমরা যেটা চেয়েছিলাম, সেটাই হয়েছে। দোকানে এসে বসার জায়গা না পেলেও ছবি তোলা বন্ধ হয় না। দোকানের ব্যতিক্রমী সজ্জা আর আয়োজন নজর কাড়ে সবার। ছবি, সেলফি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার চলতে থাকে।

দোকানের দেয়ালে আছে নানা নকশা
দোকানের দেয়ালে আছে নানা নকশাছবি: প্রথম আলো
দোকানের এসব সুন্দর নকশার অনেকটাই মালিহার খালামণি সুমাইয়া খাতুনের করা। তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেছেন। ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করা নকশা দেখে তিনি নিজেই এঁকেছেন এসব নকশা। দোকানের এককোণে সাজানো রয়েছে সুন্দর নকশার একটি কেটলি। মালিহা বললেন, কেটলিটা কেনার পর খালামণিই এটাতে নকশা করেছেন। সুমাইয়া শখেই এসব নকশা করেন। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই তাঁর। মাটির দেয়ালটা মালিহা ও মাহির নিজেরাই বানিয়েছেন। এ জন্য রাজশাহী শহর থেকে কিছুটা দূরে কাশিয়াডাঙ্গা এলাকা থেকে মাটি নিয়ে এসেছেন তাঁরা।

মাটির দেয়াল রয়েছে এককোণে
মাটির দেয়াল রয়েছে এককোণেছবি: প্রথম আলো
মাহির ও মালিহা বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে এখন পর্যন্ত লাভের মুখ দেখেনি ট্যারফ। তবে তাতে একটুও দমে যায়নি তারুণ্যের উদ্যোগ। তাঁরা আশায় আছেন। লাভের মুখ দেখা শুরু হলে আরও বড় করবেন ট্যারফ।

মাহির ও মালিহার শুরুটা অবশ্য মা-বাবার হাত ধরেই। ট্যারফের জন্য দুজনের বাবাই আর্থিক সহায়তা করেছেন মাহির ও মালিহাকে। দুজনের বাবাই ব্যবসায়ী। মাহিরের বাবার রয়েছে ডিশের ব্যবসা। আর মালিহার বাবার টাইলসের। তাই উত্তরাধিকার ব্যবসা কতটা সামলাতে পারবেন ট্যারফে এসে সেটারও পরীক্ষা চলছে দুজনের।

নকশাদার কেটলিটি বানিয়েছেন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া খাতুন
নকশাদার কেটলিটি বানিয়েছেন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া খাতুনছবি: প্রথম আলো
দল বেঁধে খেতে এসেছিলেন রাজশাহী কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী। বললেন, দোকানের পরিবেশটাই তাঁদের দারুণ পছন্দ। দোকানের একপাশে মাটির দেয়াল। তাতে আলপনা আঁকা। তুর্কি জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘সুলতান সুলেমানের’ প্রাসাদে ঝোলানো বাতির আদলে কোনায় কোনায় ঝোলানো রয়েছে আলোকবাতি।

উচ্ছ্বসিত একজন দেখালেন, চা পরিবেশনের ট্রে। কাঠের নকশাদার বাক্সের মধ্যে চার কোনায় চারটি খোপ কাটা। তাতে চায়ের কাচের গ্লাসটি সুন্দরভাবে বসানো যায়। ধরার সুবিধার জন্য রয়েছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের কাপ বা ওয়ান টাইম কাপ। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কমলা রঙের নকশাদার সেই বাক্সে চা আসা মাত্র ছবি তোলা শুরু করেন সবাই। এরপর ভিন্ন স্বাদের তুর্কি চায়ে চুমুকের পালা। সেই ধোঁয়া ওঠা চা শীতের সন্ধ্যায় অন্য রকম আমেজ এনে দেয়।

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি