1. hmgrobbani@yahoo.com : admin :
  2. noushaduddin16@gmail.com : nowshad Uddin : nowshad Uddin
  3. news@soroborno.com : Md. Rabbani : Md. Rabbani
  4. nooruddinrasel@yahoo.com : nooruddin rasel : nooruddin rasel
মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০৯:২৯ পূর্বাহ্ন

হুমায়ূন আহমেদ: ভালোবাসার কারিগর

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২০

মাজহারুল ইসলাম

চিকিৎসাবিরতি শেষে ২ জুন সকালে জেট এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে দিল্লি হয়ে নিউইয়র্ক ফিরে যাবেন হুমায়ূন আহমেদ। সঙ্গে যাবেন স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, দুই পুত্র নিষাদ ও নিনিত। তাঁদের সঙ্গে আমিও যাব নিউইয়র্কে। ১২ জুন বেলভিউ হাসপাতালে একসঙ্গে কোলন ও লিভারে সার্জারি হবে।

তিন সপ্তাহের জন্য দেশে এসেছেন তিনি। প্রতিদিনই বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। মুখোমুখি হয়েছেন মিডিয়ারও। নুহাশপল্লীর প্রধান ফটক এবং দখিন হাওয়ার দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। গতকাল আটাশ মে রাতে নিজের গড়া নন্দনকানন নুহাশপল্লী থেকে বিদায় নিয়ে এসেছেন। ফিরে আসার আগের রাতে বৃষ্টিধারায় ভেসে গেছে নুহাশপল্লী। ছিল না শুধু আকাশভরা জোছনা।

সৃষ্টির অনাদি থেকে বৃষ্টি ঝরে পৃথিবীর বুকে। বর্ষায় কদম ফোটে। জোছনায় ভেসে যায় চরাচর। কিছু ঘোরলাগা মানুষের মনে বৃষ্টি আর জোছনা আলোড়ন তোলে। কিন্তু বৃষ্টি ও জোছনা যে সাধারণের জন্যেও উপভোগ্য, সেটা আমাদের শিখিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সাহিত্য আর শিল্প সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।
প্রকৃতিও নিশ্চয়ই জানত তার বৃষ্টিবিলাসের কথা, জোছনা যাপনের কথা। তাই বোধহয় নুহাশপল্লীর পর দখিন হাওয়ায় আজ এই রাতেও বৃষ্টি তাঁর সঙ্গী। যখন তিনি বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে গান-আড্ডায় মেতে উঠেছেন, বাইরে তখন অঝোর ধারার বৃষ্টি। হুমায়ূন আহমেদ সিক্ত হয়েছিলেন বৃষ্টির অপার ভালোবাসায়। গত দুদিন জোছনার সান্নিধ্য না পেলেও বৃষ্টি ঠিকই তাঁকে সঙ্গ দিয়েছে।
আজ রাতে সপরিবারে তিনি চলে যাবেন গুলশানে, শ্বশুরবাড়িতে। বাকি দুদিন সেখানে নিরিবিলিতে থাকবেন। এসময় তাঁর মা আয়েশা ফয়েজও থাকবেন পুত্রের সঙ্গে।
সকালে অফিসে যাওয়ার সময় দেখলাম, তিনি একটা ছবি আঁকছেন। ছবি আঁকার ঝোঁক তাঁর দীর্ঘদিনের। নিউইয়র্কে চিকিৎসাকালে প্রায়ই ছবি এঁকেছেন সময় কাটানোর জন্য। সেসব আঁকা ছবি নিয়ে নিউইয়র্কে একটা প্রদর্শনী হওয়ার কথা রয়েছে। আমাকে বললেন, রাতে তো শাওনের মা’র বাড়িতে চলে যাব। সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি এসো। আনিস স্যারকে বোলো যদি ফ্রি থাকেন তাহলে সন্ধ্যায় চলে আসতে। যাওয়ার আগে স্যারের সঙ্গে একটু আড্ডা দিতে চাই। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও জুয়েল আইচকেও আসতে বলো।

তাঁর কথামতো সবাইকে সন্ধ্যায় দখিন হাওয়ায় আসতে বললাম। আনিস স্যার পরদিন সকালে কলকাতা যাবেন বলে বিকেলে এসে দেখা করে গেলেন।
আমি সন্ধ্যা সাতটায় দখিন হাওয়ায় ফিরে এসে দেখি, হুমায়ূন আহমেদের এপার্টমেন্ট ভর্তি লোক। সবাই এসেছে তাদের প্রিয় মানুষকে বিদায় জানাতে। এদের মধ্যে কাউকে কাউকে তিনি নিজে ফোন করে আসতে বলেছেন। অনেকে নিজে থেকেই এসেছেন। সোফা, চেয়ার এমনকি ফ্লোরেও এক ইঞ্চি জায়গা খালি নাই। সেখানে মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি ফ্লোরে বসে আড্ডা দিতে পছন্দ করেন। চেয়ার-টেবিলে সাধারণত বসেন না। শুধু আড্ডা না, তিনি লেখালেখিও করেন ফ্লোরে বসে। তাঁর দখিন হাওয়ার এপার্টমেন্ট ও নুহাশপল্লীতে নিচু টেবিল বানানো হয়েছে ফ্লোরে বসে খাওয়া এবং লেখালেখির জন্য। এমনকি নিউইয়র্কেও নিচে বসে লেখার জন্য একটা লো-হাইট প্লাস্টিকের কেবিনেট কেনা হয়েছে। তিনি মেঝেতে বসে কেবিনেটের ওপর লেখালেখি করেন। কেবিনেটের ড্রয়ার দুটো ব্যবহার করা হয় তাঁর ওষুধ ও চিকিৎসার কাগজপত্র রাখার জন্য।

কিছুক্ষণের মধ্যে আমি ও স্বর্ণা আড্ডায় যোগ দিলাম। তারিক আনাম খান, নিমা রহমান, সপরিবারে জুয়েল আইচ ও শাকুর মজিদ আগে থেকেই উপস্থিত। হুমায়ূন আহমেদের বন্ধু ফজলুল করিম, আলমগীর রহমান ও তাঁর স্ত্রী ঝর্না ভাবি তো আছেনই। এরমধ্যে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম চলে এসেছেন। তানিয়া ও টুটুলও এসেছে। দেশে আসার পর থেকেই হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ পুত্রের সঙ্গে আছেন সব সময়। নুহাশপল্লী, দখিন হাওয়া সব জায়গায়ই মাতা-পুত্র একসঙ্গে।
হুমায়ূন আহমেদ তাঁর চিকিৎসা ও ডাক্তারদের নিয়ে নানা রসিকতা করছেন। একপর্যায়ে তিনি দাঁড়িয়ে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে বললেন, আমি ২ জুন নিউইয়র্ক ফিরে যাব। ১২ জুন আমার সার্জারি হবে। এরপর রসিকতা করে বললেন, বিশাল সার্জারি। মরি কি বাঁচি তাঁর ঠিক নাই। সেজন্যই আজ আপনাদের ডেকেছি। মাজহার ঘরসংসার ছেড়ে দীর্ঘদিন আমার সঙ্গে নিউইয়র্কে পড়ে আছে। আমার সঙ্গে এবারেও সে নিউইয়র্ক যাবে। আগামী ৭ জুন স্বর্ণা-মাজহারের বিয়ের বারো বছর। তাদের এই যুগপূর্তির সময় স্বর্ণাকে ফেলে সে থাকবে আঠারো হাজার মাইল দূরে। তাই আজ আমি ও শাওন তাদের অগ্রিম বিয়েবার্ষিকী পালনের আয়োজন করেছি।
আমি ও স্বর্ণা দুজনেই হতবাক। দীর্ঘ নয় মাস ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। আর মাত্র কদিন পর অনেক বড় একটা সার্জারি হবে। এরমধ্যে এধরনের আয়োজন তাঁর…। আমরা এর কিছুই জানি না।
শাওন ভাবিকে হুমায়ূন স্যার বললেন, তোমার জিনিসপত্র সব নিয়ে আসো।
শাওন ভাবি এক ঝুড়ি তাজা বেলি ফুলের মালা নিয়ে এসে বললেন, এখানে ১০০ বেলি ফুলের মালা আছে।
বেলি স্বর্ণার খুব পছন্দের ফুল–এটা হুমায়ূন আহমেদ জানতেন। আমাদের দুজনকে ডাকলেন এবং হুমায়ূন আহমেদ ও ভাবি মিলে স্বর্ণার গলায়, মাথায়, খোঁপায়, হাতে বেলি ফুল পরাতে লাগলেন। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর স্বভাবসুলভ রসিকতা করে বললেন, বিয়েবার্ষিকী তো স্বর্ণার একার না, মাজহারেরও। তাকেও কিছু ফুল দাও। বলে নিজেই আমার গলায় পরানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু মালাগুলো ছোট হওয়ায় গলায় পরাতে পারলেন না। আমার মাথায় একটার পর একটা ফুলের মালা রাখলেন। সবাই করতালি দিচ্ছেন। মুহূর্তের মধ্যে সারা ঘর বেলি ফুলের সুবাসে ভরে গেল।
এরপর এল একটি কেক। সেখানে লেখা Happy 12 (?)। হুমায়ূন আহমেদের পক্ষেই কেকের ওপর এধরনের প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে রসিকতা করা সম্ভব। যাইহোক সকলের উপস্থিতিতে কেক কাটা হলো।

এরপর তাঁর আঁকা একটা ছবি আমাদের উপহার দিলেন। আমি খুব অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, এই ছবিটাই তো সকালে অফিসে যাওয়ার সময় আঁকতে দেখেছি! এরমধ্যে কখন আঁকা শেষ করে আবার বাঁধাই করেও এনেছেন। মরুভূমির মধ্যে পাতাবিহীন শুকনো একটা গাছ, যার ছায়া পড়েছে বালুর মধ্যে। ছবিটার মধ্যে একধরনের নিঃসঙ্গতা খেলা করছে। জলরঙে আঁকা অসাধারণ ছবি। আমাদের বিয়ের সময়ও তিনি একটি ছবি উপহার দিয়েছিলেন। তবে সেটা নিজের আঁকা নয়। সাজু আর্ট গ্যালারি থেকে কেনা। তেলরঙে আঁকা পার্বত্য অঞ্চলের নৈসর্গিক দৃশ্য।

বিবাহবার্ষিকীর আনন্দ-আয়োজন শেষে আবার শুরু হলো আড্ডা। নানারকম রসিকতা করছেন হুমায়ূন আহমেদ। বারোটা কেমো থেরাপি শেষ করেছেন মাত্র এক মাস আগে। অপেক্ষা করছেন কোলন ও লিভার সার্জারির জন্য। কিন্তু তাঁর মধ্যে কোনো ভয় বা টেনশন নাই। বরং উপস্থিত অনেকের চোখে মুখে একধরনের আতংকের ছাপ, তাদের প্রিয় মানুষটি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন তো ? অনেক গল্প-আড্ডা শেষে রাতের খাবার খেয়ে একে একে সবাই বিদায় নিলেন।
হুমায়ূন আহমেদের ইশারায় থেকে গেলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, জুয়েল আইচ দম্পতি, টুটুল-তানিয়া, শাকুর মজিদ, মাসুম ও কমল। আর প্রতিবেশী আলমগীর রহমান এবং আমরা তো আছিই। আবার শুরু হলো আড্ডা। তবে আগের জায়গায় না। আমরা গাদাগাদি করে নিষাদের রুমে গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণের জন্য হুমায়ূন আহমেদের ছোট বোন শেফু আপাও আড্ডায় যোগ দিলেন। হুমায়ূন আহমেদ টুটুলকে বললেন গান গাইতে। টুটুল যেন প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। আজ রাতে হুমায়ূন আহমেদ যে গান শুনতে চাইবেন সেটা অনুমান করে নিজের গিটার সঙ্গে করে এনেছে। শুরু হলো একটার পর একটা গান। মাঝে মাঝে হুমায়ূন আহমেদের রসিকতা। রাত বাড়তে লাগল। গান-আড্ডা যেন শেষ হতে চায় না। হুমায়ূন আহমেদের অনুরোধে শাওন ভাবির গানের মাধ্যমে শেষ হলো গানাড্ডা।

দখিন হাওয়ার কয়েকজন ছাড়া একে একে সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেল। এখনো গানের সুর বাতাসে ভাসছে। ঘুমন্ত শিশুপুত্র নিনিতকে কোলে নিয়ে লিফট দিয়ে নিচে নেমে গাড়িতে উঠলেন হুমায়ূন আহমেদ। সঙ্গে স্ত্রী ও আরেক পুত্র নিষাদ হুমায়ূন। গন্তব্য শ্বশুরালয়। হুমায়ূন আহমেদের গাড়ি দখিন হাওয়ার গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমরা কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছি।

এটাই যে দখিন হাওয়ায় হুমায়ূন আহমেদের বন্ধু ও স্বজনদের নিয়ে শেষ আড্ডা হবে তা কে জানত! সময় রাত একটা, ঊনত্রিশ মে, দুই হাজার বারো।

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি